স্কুলে যান না মহেষখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, দুর্নীতি-অনিয়ম চরমে

20

লালমোহন প্রতিনিধি: ভোলার লালমোহনে মহেষখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইয়াছিন ফারুকের দুর্নীতি, অনিয়ম ও নানা রকম স্বেচ্ছাচারিতায় কয়েক বছর ধরেই বিদ্যালয়ের পাঠ্যাভ্যাসের কার্যক্রম সংকটে পড়েছে। কাগজে কলমে বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা যথেষ্ট দেখালেও মূলত প্রতিদিন ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত গড়ে উপস্থিত মাত্র ৫-৭ জন।

বিদ্যালয়টি ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত, ইআইআইএন নং ১০১৫২৪। বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা আট জন, একজন অফিস সহকারী, একজন পিয়ন ও একজন নৈশ প্রহরী।

সরেজমিনে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর দুই সপ্তাহ ধরে নজর রাখছিল প্রিয়দেশ নিউজের সংবাদকর্মী। তার পর্যবেক্ষণে উপরের চিত্র তো বটেই, আরও যে বর্ণনা পাওয়া গেছে তাতে সবারই চোখ চড়কগাছ হয়ে যাবে। ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতির সংখ্যা তো একেবারেই নগণ্যই, শিক্ষকদের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠদান নিয়েও আছে প্রশ্ন। কোন শিক্ষক ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের কী পড়ালো তা নিয়েও শিক্ষকদের মধ্যে প্রায়ই হাতাহাতি এবং মারামারির ঘটনাও নেহাত কম নই।

এসব নিয়ে অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। আর এর প্রভাব পড়ছে খোদ শ্রেণীকক্ষে এমনকি ছাত্র-ছাত্রীদের ও অভিভাবকদের মাঝেও। খোদ প্রধান শিক্ষক ইয়াছিন ফারুক দুই তিন সপ্তাহ পর পর বিদ্যালয়ে আসেন। এই ধারা বজায় রেখেছেন সহকারী শিক্ষক (কৃষি) মমিন উল্যাহ। তারা দুজন বিদ্যালয়ে তাদের খেয়াল খুশি মতো আসেন এবং একজন অন্যজনের হাজিরা সিটে এবসেন্ট লিখে রাখেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে প্রায়ই শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে হাতাহাতি এমনকি অকথ্য ভাষায় গালমন্দের ঘটনাও ঘটে। বিষয়গুলো উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও একাডেমিক শিক্ষা অফিসারের নিকট অন্যান্য শিক্ষকরা জানালেও তারা এসে এসব অনিয়ম দুর্নীতির প্রমাণ পেলেও অদৃশ্য কারণে কোন প্রকার ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।

শুধু এরা নয় স্কুলে মারামারির ঘটনাও ঘটিয়েছে ইংরেজি ও গণিত শিক্ষক, এমন অভিযোগও করেছে একাধিক ছাত্র। বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের অবস্থাটিও একাবারে নাজুক। ভবন আসলেও তার পুরো টাকা মেরে দিয়েছেন প্রধান শিক্ষক ইয়াছিন ফারুক। অন্যান্য শিক্ষকরাও বিভিন্ন উৎসবের ভাতা পেয়ে থাকলেও তার পুরোটাই যায় প্রধান শিক্ষকের পকেটে। সেই টাকার ভাগ পান কৃষি শিক্ষক মমিন উল্যাহ। এছাড়াও বিভিন্ন পরীক্ষার সময় ভুয়া ছাত্র-ছাত্র সাজিয়ে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে গিয়ে রেজিষ্ট্রেশন করা এবং পরীক্ষা আসলে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এক জনের পরীক্ষা অন্য জনকে দিয়ে পাস করারও প্রমাণ আছে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক মমিন উল্যাহর বিরূদ্ধে। মূলত প্রধান শিক্ষক ইয়াছিন ফারুকের অফিসিয়াল ও বরিশাল বোর্ডের কাজগুলো করেন সহকারী কৃষি শিক্ষক মমিন উল্যাহ।

ভয়াবহ বিষয় হলো- সম্প্রতি প্রকাশিত এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায়ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন প্রধান শিক্ষক ইয়াছিন ফারুক। রুহুল আমিন ও পারভিন দম্পতির ছেলে মোঃ রাশেদের পৌরনীতি এক বিষয়ের পরীক্ষা এক লক্ষ টাকার বিনিময়ে তার আপন ভাইয়ের ছেলেকে দিয়ে পাস করিয়ে দিয়েছেন। সেদিন মোঃ রাশেদ নারায়ণগঞ্জের একটি গার্মেন্টসে ডিউটিরত ছিলেন বলেও রাশেদ স্বীকার করেছেন। পরীক্ষার দিন বিষটি স্থানীয় সাংবাদিকরা জানতে পেরে গজারিয়া বালিকা স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে সেই জালিয়াতি করা ছাত্রকে হাতেনাতে ধরে ফেললে কেন্দ্র সচিব এমদাদুল হক সেলিম প্রধান শিক্ষক ইয়াছিন ফারুককে ফোন করে পরীক্ষা কেন্দ্রে আসতে বলেন। ততোক্ষণে পরীক্ষার নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যায়। প্রধান শিক্ষক ইয়াছিন ফারুক অবশেষে না আসায় কেন্দ্র সচিব স্থানীয় সাংবাদিকদের কোনমতে ম্যানেজ করে পাঠিয়ে দেন। পরে জানা গেল রাশেদের বাংলাদেশ সচিবালয়ের কোন এক দপ্তরে নিয়োগের কথা ছিল, আর সেজন্যই তার পরিবার প্রধান শিক্ষক ইয়াছিন ফারুকের সাথে আলাপ করলে তিনি এই ভয়াবহ জালিয়াতি করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক ইয়াসিন ফারুক এসব অনিয়ম প্রতি বছরই করেন, আর তার এসব কাজে সহায়তা করেন কৃষি শিক্ষক মমিন উল্যাহ।

স্থানীয় অভিভাবকরা জানান, প্রধান শিক্ষক ইয়াছিন ফারুক তো বিদ্যালয়ে মাসের পর মাস অনুপস্থিত, কৃষি শিক্ষক মমিন উল্যাহও বেশিরভাগ সময় অনুপস্থিত থাকেন। সে তার ব্যক্তিগত কাজে ঢাকা-বরিশাল পড়ে থাকেন। তারা দুজন মাসে এক দুই বার বিদ্যালয়ে এসে পুরো মাসের হাজিরা সিটে স্বাক্ষর করেন। আর এতে দুজনের মধ্যে ঝগড়া-মারামারি লেগেই থাকে।

প্রধান শিক্ষক ইয়াছিন এবং কৃষি শিক্ষক মমিন উল্যাহ এই শিক্ষার্থীর পরীক্ষা অন্যজনকে দিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন বলে অভিযোগ। পরে ধরা পড়ায় এ বিষয়ে তদন্ত কমিটিও হয়েছে।

প্রিয়দেশ নিউজকে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থী অনেক কমে গেছে এটা সত্য। ওই প্রতিষ্ঠানের আরও কিছু সমস্যা ছিল। আমরা ইতিপূর্বে এই বিষয়গুলো নিয়ে বসেছি। তবে প্রক্সির বিষয়টা আমার জানা নেই। এমন কিছু ঘটে থাকলে পরীক্ষা কমিটির প্রধান হিসেবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বোর্ডে জানানোসহ বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা অবশ্যই নিয়েছেন। এরপরও নতুন বছরে মহেষখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নেবো। কোনো ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পরীক্ষায় প্রক্সি জালিয়াতির বিষয়ে গজারিয়া বালিকা স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্র সচিব এমদাদুল হক সেলিম বলেন, হ্যাঁ, মহেষখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর এমন একটি বিষয় হয়েছিল। পরে এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। তদন্ত কমিটি এ বিষয়ে রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দিয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিক দিন মহেষখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গিয়েও প্রধান শিক্ষক ইয়াছিন ফারুক এবং কৃষি শিক্ষক মমিন উল্যাহকে পাওয়া যায়নি। পরে প্রধান শিক্ষক ইয়াছিন ফারুকের মোবাইল ০১৭৩৪-০৪**১৯ নাম্বারে একাধিক দিন মোট ৪ বার ফোন দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।