হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির কাউন্সিল: ১৬ বছর পর সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চ

দীর্ঘ ১৬ বছরের স্থবিরতা ভেঙে আগামী ২০ আগস্ট ২০২৫ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির বহুল প্রতীক্ষিত কাউন্সিল ও সম্মেলন।এই আয়োজনকে ঘিরে জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নতুন সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে,এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও আলোচনার ঝড় বইছে।

আগামী ২০ আগস্টের কাউন্সিল কেবল একটি আনুষ্ঠানিক নির্বাচন নয়—এটি হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির পুনর্গঠন, শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।প্রধান অতিথি থাকবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান,উদ্বোধন করবেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এতো বড় অংশগ্রহণ সিলেট বিভাগের রাজনৈতিক গুরুত্বকেই প্রতিফলিত করে।

হবিগঞ্জ জেলা বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সিলেট বিভাগের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৯০-এর দশকে বিএনপির শাসনামলে হবিগঞ্জ থেকে একাধিক নেতা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং দলীয় আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ২০০১–২০০৬ মেয়াদে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃত্বের সমন্বয়ে দলটি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হয়। তবে ২০০৯ সালের পর নিয়মিত কাউন্সিল না হওয়ায় জেলা সংগঠনে নেতৃত্বের নবায়ন থেমে যায়, যা ধীরে ধীরে সাংগঠনিক দুর্বলতা তৈরি করে।

সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ কাউন্সিল হয়েছিল ৩০ ডিসেম্বর ২০০৯—সভাপতি হন সৈয়দ মো. ফয়সল এবং সাধারণ সম্পাদক হন জি কে গউছ। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে আহ্বায়ক কমিটি গঠন হলেও, ২০২৪ সালের আগস্টে আহ্বায়ক মো. আবুল হাশিম দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কৃত হন। এরপর থেকে জি কে গউছ ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্বে জেলা বিএনপির কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্মেলন সফল করতে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি উপকমিটি এবং কাউন্সিলের জন্য দলের ১৭ জন দলীয় আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি নির্বাচন কমিশনও গঠন করা হয়েছে।

এদিকে গত মাসখানেক যাবৎ জেলা বিএনপিতে কে হচ্ছেন সভাপতি আর কে হচ্ছেন সাধারণ সম্পাদক নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে আলোচনা সমালোচনা।

সভাপতি হিসেবে শোনা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট বিভাগ) ও জেলা বিএনপির ১ম যুগ্ম আহ্বায়ক জি কে গউছ, কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ স্থানীয় বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শাম্মী আক্তার, সাবেক এমপি শেখ সুজাত মিয়া।

সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ইসলাম তরফদার তনু, মিজানুর রহমান চৌধুরী, অ্যাডভোকেট এনামুল হক সেলিম, অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন সেলিম, গোলাম কিবরিয়া চৌধুরী বেলাল।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক জিকে গউছ বলেন, আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শ্রদ্ধেয় তারেক রহমানের নির্দেশে ও সুচিন্তিত পরিকল্পনায় হবিগঞ্জসহ সিলেট বিভাগের সব জেলায় দ্রুত কাউন্সিলের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। ২০ আগস্ট হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির কাউন্সিলের দিন তারিখ নির্ধারিত হয়েছে এবং প্রস্তুতি নিচ্ছে জেলা বিএনপি।

তিনি জানান, জেলা বিএনপির ১৫টি ইউনিট ও ১১টি অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের সুপার ফাইভ নেতৃবৃন্দ কাউন্সিলে প্রার্থী হতে চাইলে তাদের স্ব স্ব পদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে। সভাপতি, সিনিয়র সহ সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক, এই ৫টি পদে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই কাউন্সিল ও সম্মেলনের মাধ্যমে দলীয় শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হবে।

দীর্ঘ বিরতির পর আসন্ন কাউন্সিল নিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীরা উচ্ছ্বসিত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রিয় প্রার্থীদের সমর্থনে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, অতীত আন্দোলন-সংগ্রামের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ডিজিটাল প্রচারণা ভোটারদের মানসিকতায় প্রভাব ফেলতে পারে এবং নেতৃত্ব নির্বাচনে একটি অনানুষ্ঠানিক ‘জনমত জরিপ’ হিসেবে কাজ করতে পারে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সম্ভাব্য প্রভাবরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির কাউন্সিলের ফলাফল কেবল জেলার নেতৃত্ব নয়, বরং সিলেট বিভাগের সার্বিক রাজনৈতিক অবস্থানেও প্রভাব ফেলতে পারে। শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব গড়ে উঠলে ভবিষ্যতের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির মাঠপর্যায়ের কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হবে। তবে প্রক্রিয়ায় অনিয়ম বা বিভক্তি তৈরি হলে উল্টো প্রভাব পড়তে পারে।

এই কাউন্সিল জেলা বিএনপির জন্য একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ। সুষ্ঠু নির্বাচন, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং কেন্দ্রীয়-জেলা নেতৃত্বের সমন্বয় নিশ্চিত হলে এটি দলকে সাংগঠনিকভাবে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবে। আর ব্যর্থ হলে এটি আবারও রাজনৈতিক স্থবিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।