দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্কের পুনর্গঠন

প্রায় তিন দশকের নীরবতা ভেঙে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার আগামী ২৩ আগস্ট ঢাকা আসছেন দুই দিনের সরকারি সফরে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এই সফরকে বিশ্লেষকরা দেখছেন কৌশলগত অক্ষের পরিবর্তনের সম্ভাব্য সূচনা হিসেবে।

পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার আসছেন আগামী ২৩ আগস্ট ২০২৫ তারিখে দুই দিনের সরকারি সফরে—প্রায় তিন দশক পর কোনো পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম দ্বিপক্ষীয় ঢাকা সফর। আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল আনুষ্ঠানিক সফর নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে সম্ভাব্য এক নতুন মোড়।

সফরকালে দার অংশ নেবেন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে, যেখানে আলোচ্য বিষয় থাকবে বাণিজ্য, হালাল ফুড প্রসেসিং, কানেকটিভিটি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, কৃষি, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ। একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (MoU) সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। আলোচনায় সার্কভিত্তিক আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

স্থবিরতা থেকে সম্পৃক্ততায়
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্ক কার্যত স্থবির ছিল—অমীমাংসিত ঐতিহাসিক ইস্যু ও রাজনৈতিক উত্তেজনায় ঢাকা-ইসলামাবাদ সংলাপ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সে সময়ের পররাষ্ট্রনীতি ছিল অনেকাংশে দিল্লিমুখী, যা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের জন্য কোনো ইতিবাচক সুযোগ তৈরি করতে পারেনি।

জুলাই ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের জন্য একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছেন, যা পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন করে কূটনৈতিক সংলাপের পথ খুলে দিয়েছে।

কূটনৈতিক প্রস্তুতির ধাপগুলো
গত এক বছরে নীরবে হলেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে—
পাকিস্তানিদের ওপর আরোপিত ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
করাচি ও চট্টগ্রামের মধ্যে সরাসরি কার্গো শিপ সার্ভিস চালু।
পাকিস্তানের দুই বেসরকারি বিমান সংস্থা ফ্লাই জিন্নাহ ও এয়ার সিয়াল-কে সরাসরি ঢাকা ফ্লাইটের অনুমোদন।
সামরিক সহযোগিতা পুনরায় চালু, জানুয়ারি ২০২৫-এ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের পাকিস্তান সফর।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ‘আমান-২০২৫’ নৌমহড়ায় অংশগ্রহণ।
এপ্রিল ২০২৫-এ ১৫ বছর পর পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক পুনরায় শুরু।

আলোচ্যসূচি ও ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য
২৪ আগস্ট রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন-এর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন ইসহাক দার। তিনি অন্তর্বর্তী প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও তাঁর বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে।

আলোচনায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইস্যু আসতে পারে, তবে বাংলাদেশ জানিয়েছে এটি অন্য আলোচ্য বিষয়গুলোর অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করবে না। পাকিস্তানও সব ধরনের দ্বিপক্ষীয় ইস্যু, এমনকি সংবেদনশীল ঐতিহাসিক বিষয় নিয়েও আলোচনা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে।

ভারতের প্রতিক্রিয়া ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
এই সফরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব মূলত দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত বাস্তবতায় নিহিত। বাংলাদেশ-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা নিয়ে ভারতীয় মিডিয়ায় ইতিমধ্যেই নেতিবাচক প্রচার শুরু হয়েছে। সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক বীণা সিক্রিসহ কিছু মহল দাবি করছে, সামরিক সহযোগিতা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা স্পষ্ট বলেছেন—বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণে ভারত কোনো ভূমিকা রাখবে না, যেমন ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়েও বাংলাদেশ হস্তক্ষেপ করে না।

বিশেষজ্ঞদের মতামত
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সফর কৌশলগত পর্যায়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করেছে—অধ্যাপক এম. শহীদুজ্জামান মনে করেন, আঞ্চলিক বৈরিতা মোকাবিলায় নিরাপত্তা ও কৌশলগত সহযোগিতা, বিশেষত সামরিক প্রশিক্ষণে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো উচিত।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর নিয়ে বলেন, নিশ্চিতভাবেই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সফর। কয়েক দশক পর এই রাজনৈতিক সফরটি হচ্ছে। এ সফরের মাধ্যমে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারিত হতে পারে। তিনি বলেন, প্রায় দেড় দশক ধরে দুদেশের সম্পর্ক একেবারেই স্থবির হয়েছিল। এখন নতুন একটি ভিত্তি পাবে বলে মনে করি। এছাড়া মানুষে মানুষে যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের কিছু অমীমাংসিত ইস্যু রয়েছে। টেকসই সম্পর্কের জন্য এগুলোর সমাধান জরুরি।

পাকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার রুহুল আলম সিদ্দিক বিগত সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থবির করে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। ভিসা বন্ধ করা ছিল একটি অমানবিক পদক্ষেপ। পাকিস্তানে প্রায় ২৫ লাখ বাঙালি রয়েছে। বছরের পর বছর তারা তাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে পারেনি। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখতেই হবে।আয়েশা সিদ্দিকা, কিংস কলেজ লন্ডনের সিনিয়র ফেলো, এ ঘনিষ্ঠতাকে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, যা ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্য মোকাবিলায় কার্যকর হতে পারে।

সামনে যা হতে পারে
যদি এই সফর সফ ল  হয়, তবে—
১.সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাজনৈতিক সংলাপ পুনরুজ্জীবিত হবে।২.বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কাঠামো সম্প্রসারিত হবে।৩.প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।৪.সার্ক ও অন্যান্য বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে যৌথ উদ্যোগ বাড়বে।
দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও স্থবিরতার পর এই ঐতিহাসিক সফর দুই দেশের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত কৌশলগত বাস্তবতায় নিজেদের সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার এক বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে। ঢাকা ও ইসলামাবাদ যখন আবার সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসছে, এর প্রভাব পুরো অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যে অনুভূত হতে পারে।