শেখ হাসিনার আশ্রয় নাকচ করার খবর দিল্লীকে কেন জানিয়েছিল লন্ডন?

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনা লন্ডনে যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাকে ব্রিটেনে আশ্রয় দেয়নি দেশটির সরকার। ভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংবামাধ্যমের খবর অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশ শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়নি, বরং বিষয়টি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। এরমধ্যে যুক্তরাজ্য তাদের দিল্লী দূতাবাসের মাধ্যমে ভারত সরকারকে বিষয়টি জানিয়ে দেয়।

বিবিসি বাংলাসহ বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশিত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে যে, শেখ হাসিনাকে না জানিয়ে যুক্তরাজ্য বিষয়টি কেন ভারত সরকারকে জানালো? তাহলে ব্রিটেনে শেখ হাসিনার আশ্রয়ের আবেদন বা যোগাযোগ কি তাহলে ভারত সরকার করেছে? নাকি শেখ হাসিনা করেছেন?

লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার আকবর হোসেন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ব্রিটেনে অফিসিয়ালি আশ্রয় চেয়েছিলেন বলে আমার জানা নেই। ৫ আগস্টের সেসময় সোশ্যাল মিডিয়া এবং কিছু সংবাদমাধ্যমে এমন খবর দেখলেও পরবর্তীতে লন্ডন হাইকমিশনে যোগ দিয়ে এমন কোন ডকুমেন্টস আমি পাইনি। এটা অফিসিয়াল চ্যানেলের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে তিনি চাইতে পারেন। এছাড়া ৫ আগস্ট তার পতন হওয়ার ফলে তিনি তখন সরকারের কেউ ছিলেন না, সেজন্য এ ধরনের বিষয়গুলো হাইকমিশনের অফিসিয়াল চ্যানেলে হওয়ার কথা নয়।

‘বিশ্বের বহু রাজনৈতিক নেতা ও ক্ষমতাচ্যুত সরকারপ্রধানকে আশ্রয় দেওয়ার সুদীর্ঘ ইতিহাস যুক্তরাজ্যের রয়েছে। তবে শেখ হাসিনার মতো স্বৈরশাসকদের সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় দেওয়া হয়ে থাকে। এ ধরনের কাউকে ব্রিটেনে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে কিনা, এ মুহূর্তে আমি বলতে পারছি না’, বলেন হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার ও বিবিসির সাবেক সাংবাদিক আকবর হোসেন।

৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনা কোন দেশে আশ্রয় নিচ্ছেন, দিল্লী এবং ঢাকায় এমন জল্পনা-কল্পনা যখন তুঙ্গে তখন যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে নিউজ করেছিল ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় বা সাময়িক শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় চাইবার জন্য কাউকে ভ্রমণ করার অনুমতি দেয় না দেশটির ইমিগ্রেশন আইন। যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে হলে প্রথমে তিনি যে দেশে নিরাপদে পৌঁছেছেন সেখানেই আশ্রয়ের আবেদন করতে হবে।

সেই অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে প্রথমে ভারতেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করতে হতো। ব্রিটেনসহ একাধিক দেশের অ্যাসাইলাম নাকচের পর ভারত শেখ হাসিনার সাথে বন্ধুত্বের বিষয় চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত অতিথি বিবেচনায় তাকে যতদিন ইচ্ছা ভারতে থাকার অনুমতি দেয়। তবে এ ঘটনায় সংসদে প্রশ্নের মুখে পড়েছিল বিজেপি সরকার। ভারতীয় এমপি আসাদ উদ্দিন ওয়াইসি’সহ বেশ কয়েকজন এমপি প্রশ্ন তুলেছিলেন, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে কেন আশ্রয় নিয়েছেন এবং বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিচ্ছেন। একটি দেশ হিসাবে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সম্পর্ক হওয়া উচিত; কোনও বিশেষ পরিবারের সঙ্গে নয়।

সেসময় শেখ হাসিনার মার্কিন ভিসাও বাতিল করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ এইটিনসহ বেশকিছু মিডিয়ায় তখন এ খবর প্রকাশ হয়েছিল। তিনি ইউরোপীয় কয়েকটি দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন বলে সেসব প্রতিবেদনে বলা হয়। এছাড়া ঠিক কী কারণে শেখ হাসিনাকে ব্রিটেন বা অন্য দেশগুলো শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিলো না? পাকিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত সরকারপ্রধান পারভেজ মোশাররফ, নওয়াজ শরীফ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ওয়ান ইলেভেনের সময় ব্রিটেনে আশ্রয় পেলেও কী কারণে শেখ হাসিনা দেশটিতে আশ্রয় পেলেন না?

বিবিসি বাংলায় চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত দিল্লী থেকে পাঠানো এক প্রতিবেদনেও সেদিনের ব্রিটেন সরকারের আশ্রয় প্রত্যাখ্যান করার কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‌৫ আগস্ট বিকেল থেকেই দিল্লি প্রবল জল্পনায় সরগরম ছিল, শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত ভারত থেকে কোন দেশে পাড়ি দিচ্ছেন! ব্রিটেন তো তালিকায় ছিলই, সঙ্গে নরওয়ে বা সুইডেনের মতো কোনও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ বা এমনকি বেলারুশের কথাও শোনা যাচ্ছিল।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘শেখ হাসিনা তখনও বাংলাদেশের ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্টধারী, সঙ্গী বোন শেখ রেহানাও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক– ফলে ৫ আগস্ট রাতেই দিল্লি থেকে তারা অনায়াসে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা হয়ে যাবেন, ভারত সরকার প্রথমে এমনটাই ভেবেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার সেই পরিকল্পনায় বাদ সাধে। দিল্লিতে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে নতুন প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টার্মারের সরকার ভারতকে জানিয়ে দেয়, শেখ হাসিনাকে এখনই তারা সে দেশে আসতে দিতে পারছে না।’

ব্রিটেন সরকার শেখ হাসিনার লন্ডনযাত্রা নাকচের বিষয়টি দিল্লীকে কেন জানালো? এমন প্রশ্নে উত্তর খুঁজতে দিল্লীতে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের সাথে যোগাযোগ করে প্রশ্ন করা হয়, শেখ হাসিনার হয়ে লন্ডনে যাওয়ার কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি কি তাহলে ভারত সরকারই করেছিল? জবাবে জানা যায়, ‘‘শেখ হাসিনার লন্ডনযাত্রা কী কারণে বাতিল হয়েছে, সেটি ভারত কিংবা ব্রিটেন সরকার কেউই প্রকাশ করেনি। এটি বলতে তারা বাধ্যও নয়। কারণ, এটি বিশেষ এক পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া আশ্রয়ের আবেদন কোন্ পক্ষ থেকে করা হয়েছে সেটিও কেউই পরিষ্কার করেনি।

তবে যে পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, এবং ভারতের আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তটা রাজনৈতিক। একইভাবে ব্রিটেনের প্রত্যাখ্যানের বিষয়টিও রাজনৈতিক। সেসময় শেখ হাসিনা বিশেষ পরিস্থিতিতে ভারতের অতিথি ছিলেন। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় তার নিজের পক্ষে বাংলাদেশের কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করে আবেদন করা সম্ভবপর ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই যোগাযোগটা ভারতের পক্ষ থেকেই হওয়ার কথা। এছাড়া সেই সময় শেখ হাসিনা কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী ছিলেন। কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীরা যেকোন সময় অন্য দেশে যেতে পারেন। ব্রিটেনের উদ্দেশে শেখ হাসিনাকে নিয়ে বিশেষ বিমান যেহেতু ভারত থেকে ছাড়া হবে, সেজন্য ক্লিয়ারেন্স চাওয়ারও বিষয় ছিল। এজন্য শেখ হাসিনার লন্ডনযাত্রা প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি ব্রিটেন সরকার ভারতকে জানানোটাই স্বাভাবিক। তবে কী কারণে লন্ডনযাত্রা প্রত্যাখ্যান হয়েছে, সেটি উল্লেখ করতে কোন দেশের সরকারই বাধ্য নয়, উল্লেখ করেওনি।’’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সায়মা আহমেদ বলেন, পৃথিবীর সব দেশেই পলিটিক্যাল অ্যাসাইলামের কেসগুলো ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট যখন দেশ থেকে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেন, তখন তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল, শত শত মানুষ খুনের অভিযোগ ছিল। আল-জাজিরা, বিবিসি, নিউইয়র্ক টাইমস’সহ স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সুবাদে সেসময় পৃথিবীর সব দেশই বাংলাদেশে তার গণহত্যা এবং ডিক্টেটরশিপের বিষয় জানত। সুতরাং যেসব দেশ হিউমান রাইটস এবং ডেমোক্রেসি প্রমোট করে তাদের পক্ষে শেখ হাসিনাকে অ্যাসাইলাম দেওয়া সম্ভব ছিল না। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিলে তারা আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনায় পড়ত। ব্রিটেন শেখ হাসিনার লন্ডনযাত্রা প্রত্যাখ্যান করার এটা একটা কারণ হতে পারে।

ড. সায়মা আহমেদ জানান, ভারত নিজ দেশের নাগরিকদের সাথেও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে থাকে। নিজ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারেও তারা বাধা দেয়। গত ১৬ বছরে তারা শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনকে নিঃশর্তভাবে প্রমোট করে এসেছে। সেজন্য তারা ডেমোক্রেসির বদলে স্বৈরাচারকে সেখানে আশ্রয় দিয়েছে। তবে ব্রিটেন বা অন্য কোন দেশ ডেমোক্রেসির বাইরে গিয়ে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় না দেওয়াটাই স্বাভাবিক।