
ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেনের দক্ষিণ সিটি বিষয়ে সাম্প্রতিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে মতামত দিয়েছেন সাবেক ছাত্রনেতা সাহাবুদ্দিন লাল্টু। এতে তিনি ইশরাক হোসেনকে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছেন।
ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি বলেন, “ইশরাক হোসেনের উচিত ছিল ধৈর্য ধরা এবং উপযুক্ত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করা। নির্বাচনের অনুকূল পরিস্থিতিতে জনগণের ভোটেই তিনি একদিন মেয়র হতে পারতেন।”
তিনি বলেন, ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে মীর্জা আব্বাসকে ঢাকা সিটির প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। সম্ভবতঃ ৯২ সালে নির্বাচন হলে মীর্জা আব্বাস বিএনপির প্রার্থী হিসেবে হেরে যান। বিজয়ী হন হানিফ। এই একটি নির্বাচনই সুষ্ঠু হয়েছিল। আর কোনদিন হয় নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি, নয়তো নির্বাচনে সরকারী দলের প্রার্থীর বিপক্ষে কেউ দাড়ায়নি।
সাহাবুদ্দিন লাল্টু বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সাদেক হোসেন খোকা প্রথমে মন্ত্রী হন। কিছুদিন পর জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপকভাবে পরাজিত আওয়ামী লীগকে অপ্রস্তুত রেখে কিংবা কোন না কোন ভাবে ম্যানেজ করে মেয়র নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়ে মেয়রের দায়িত্ব পালন শুরু করেন। উনি তখন ঢাকা সিটি বিএনপির সভাপতি ছিলেন।
বিএনপির জোট সরকারের সময়কার ছাত্রদলের এই সভাপতি বলেন, ২০০৬ সালের শেষের দিকে বিএনপি ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়। কিছুদিন পর মেয়র হিসেবে সাদেক হোসেন খোকার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। তারপরও উনি মঈন-ফখরুদ্দিন সরকারের পুরো দুই বছর মেয়র থাকেন। অনেকেই মনে করতেন যে, তিনি তখনকার দিনের সংস্কারবাদীদের পক্ষ নেয়ায় তখনকার সরকার তাকে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়নি। অবাক করার বিষয় হলো হাসিনা ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ক্ষমতায় আসার পরও উনি আরো তিন বছর মেয়র পদে আসীন থাকেন। এটা ছিলো অসম্ভবকে সম্ভব করার মত একটি বিষয়। মঈন-ফখরুর সময় দল মূলতঃ চালিয়েছিলেন খন্দকার দেলোয়ার হোসেন। উনি সাদেক হোসেন খোকাকে সংস্কারবাদীদের পক্ষ নেয়ায় অপছন্দ করতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে মঈন-ফখরুর সরকার বিদায় নেওয়ার পর হাসিনা ক্ষমতায় আসেন। এদিকে বিএনপি চেয়ারপার্সন মুক্ত হয়ে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেন। বিএনপি ৩০টি আসন পায়। তারপর বিরোধী দলের রাজনীতি করতে শুরু করে বিএনপি।
সেসময়কার ইতিহাস স্মরণ করে দিয়ে সাহাবুদ্দিন লাল্টু বলেন, তখন ঢাকা মহানগর বিএনপির পূর্নাংগ কমিটি করার প্রশ্ন উঠে। সাদেক হোসেন খোকাকে সভাপতি বানানোর প্রসংগ উঠে। কিন্তু খন্দকার দেলোয়ার কিছুতেই তা মেনে নিতে চাননি বলে জানা যায়। এমনকি উনি যতদিন বেঁচে ছিলেন, খোকা ততদিন সভাপতি হতে পারেননি। আর ২০০৬ সালে ঢাকার সবগুলো আসনের মধ্যে খোকা একমাত্র পাস করেন। সে কারণে উনাকে ঢাকা সিটির দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি একবার যখন দায়িত্ব পান, তিনিই শুধু ঢাকা সিটির নেতা হবার সুযোগ পান। নতুন নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি না হওয়ায় দল ঢাকাতে খুবই দূর্বল হয়ে যায়। ১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনকালীন আন্দোলনে ঢাকার বিএনপির ব্যর্থতা চরমভাবে পরিলক্ষিত হয়। চূড়ান্ত আন্দোলনকালীন সময়ে উনি আত্মগোপনে চলে যান। ফলে ভয় পেয়ে অন্যান্য অনেকে আত্মগোপন করেন।
সাবেক এই ছাত্রনেতা বলেন, নেতা আত্মগোপন করে কর্মীদেরকে রাজপথে রেখে আন্দোলন সফল করার ইতিহাস বিরল। যাই হোক, পরবর্তীকালে খোকা যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। আমৃত্যু তিনি সেখানেই থাকেন। এদিকে তাঁর ছেলে ইশরাক বয়সে কিছুটা বড় হন। তিনি কোনদিনই ছাত্রদলের রাজনীতি করেন নি। তার একমাত্র পরিচয় তিনি খোকার ছেলে। প্রধানতঃ এই পরিচয়ে তিনি ঢাকা সিটির মত যায়গায় বিএনপির মত এত বড় দলের মনোনয়ন পান।
ইশরাক প্রসঙ্গে সাহাবুদ্দিন লাল্টুর মন্তব্য, “তিনি কখনো ছাত্রদলের রাজনীতিতে ছিলেন না। মূলত পিতার পরিচয়েই তিনি মনোনয়ন পান। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মানুষের সরকারবিরোধী মনোভাবের কারণে তার জয় সম্ভব ছিল। কিন্তু সেই সময় এখন আর নেই।”
‘‘হাসিনার আমলে কোন নির্বাচনই সুষ্ঠু হতো না। মানুষ হাসিনার দুঃশাসনে অতিষ্ঠ ছিলো। সেজন্য হাসিনার প্রার্থী যেই হতো, তার বিরুদ্ধে অন্য যেই দাড়াতো, তাকেই মানুষ ভোট দিয়ে দিতো। সে কারনেই চট্টগ্রামের মন্জুর মহি উদ্দিনের মত প্রার্থীকে হারিয়ে দিতে পারতেন। হিরো আলমের মত লোকের কাছে আরাফাত সুষ্ঠু নির্বাচন হলে হেরেই যেত। আমি বলছি না যে, ইশরাক হিরো আলমের মত প্রার্থী ছিলেন। তবে উনি তখন সুষ্ঠু নির্বাচন হলে পাস করতেন প্রধানতঃ এই কারণে যে, মানুষ তখন হাসিনার প্রতি ভয়ানক অসন্তুষ্ট ছিল।
কিন্তু হাসিনা তো এখন আর নেই। তাই ইশরাকের উচিত ছিলো পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করা। এটুকু ধৈর্য্য ধরলে ঠিকই উনি একদিন মানুষের ভোটেই নির্বাচিত হয়ে মেয়র হতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে যা করেছেন, তাতে আমার দেশের মত পত্রিকা শুধু উনার কারণে একটি ইক্সক্লুসিভ নিউজ করেছেন। ইশরাক নিজেও ২/৩দিন আগে আমার দেশ নিয়ে মন্তব্য করেছেন। এতে বিএনপি কিংবা ইশরাক কতটুকু উপকার পাবেন, তা আমার জানা নেই। তবে নিউজের এই লিংকটি হয়তো অনলাইনে ঘুরে বেড়াবে আগামী ২০/৫০ বছর। আর যখন বিএনপি বিরোধীরা কথা বলবে, এই লিংকটিকেও ব্যবহার করতে ছাড়বে না’’ বলেন সাহাবুদ্দিন লাল্টু।
সাবেক ছাত্রনেতা লাল্টুর মতে, “দেশ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। গণতন্ত্রের পথে না চললে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও মূল্য দিতে হবে।” বলেন, ‘‘হাসিনা এক সময় মনে করতেন দেশটা তার বাবার। তাই তিনি যা খুশী তাই করতেন। আবার তা তিনি বলেও বেড়াতেন। তিনি বলতেন, এই দেশ আমার। আমার বাবা এটা স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। স্বাধীন যদি উনি করে দিয়েও থাকেন, দেশ শেখ মুজিবের, নাকি দেশের সব মানুষের। এমনকি যে শিশুটি আজো জন্মই নেয়নি, দেশটি তারও। আমরা যেন সকলে এ সত্যটি উপলব্ধি করি। এবং সে মোতাবেক কাজ করি। তা না হলে হাসিনার পরিণতি আমাদেরকেও ভোগ করতে হবে। এবং তা হাসিনার চেয়েও অনেক আগে ভোগ করতে হবে। হাসিনা ১৬ বছর টিকে ছিলেন। অন্য কেউ বোধ করি ৫/৭ বছরও টিকবেন না। টিকবেন কি?’’
সবশেষে সাহাবুদ্দিন লাল্টু বলেন, ‘আমার এই লেখা কাউকে ছোট করার জন্য নয়। বরং আমার দেশের ওই নিউজটি শুনার পর মনে হলো কথা গুলো লিখি। তাই লিখলাম।’


