
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন-২০২২ সংশোধন বিল উত্থাপন করার সময় ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’র সংজ্ঞা থেকে জামায়াতে ইসলামীর নাম বাদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দলটির আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, “আল্লাহ ভালো জানেন ৭১ সালের এই চরম সময়ে কার কি ভূমিকা ছিল।”
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১২তম দিনে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন-২০২২ সংশোধনের লক্ষ্যে একটি বিল উত্থাপন করেন। এ সময় শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে এ আহ্বান জানান।
বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “এই বিল নিয়ে এনসিপি কোনও আপত্তি জানায়নি। এনসিপি লিখিতভাবে সংসদকে তাদের মতামত জানিয়েছে।”
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন-২০২২ এর সংজ্ঞায় ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ অর্থ বলতে বলা হয়েছে– যাহারা ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মার্চ হইতে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে গ্রামে-গঞ্জে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করিয়াছেন এবং যে সকল ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করিয়া ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে তাহাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করিয়াছিলেন এবং বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হইয়া হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাহাদের এই দেশীয় সহযোগী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ করিয়াছেন, এরূপ সকল বেসামরিক নাগরিক উক্ত সময়ে যাহাদের বয়স সরকার কর্তৃক নির্ধারিত সর্বনিম্ন বয়সের মধ্যে; এবং সশস্ত্র বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ই.পি.আর), পুলিশ বাহিনী, মুক্তি বাহিনী, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) ও উক্ত সরকার কর্তৃক স্বীকৃত অন্যান্য বাহিনী, নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্স, আনসার সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হইবেন। এছাড়া হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাহাদের সহযোগী কর্তৃক নির্যাতিত সকল নারীও (বীরাঙ্গনা) মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃত হবেন।
বিরোধীদলীয় নেতা সংসদে বলেন, “এই বিলে প্রস্তাবনা করা হয়েছে যে জিনিসটা, স্বাধীনতার পরে তখনকার শাসকও আনেন নাই। মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও আনেন নাই। তিনবারের অতি সম্মানীয় প্রধানমন্ত্রী তিনিও আনেন নাই। এ জিনিসটা নিয়ে আসলেন সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করে ফ্যাসিস্টের বিকৃত একজন প্রতিভূ শেখ হাসিনা এবং পরবর্তী পর্যায়ে ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে সামান্য পরিবর্তনসহ। কী আছে এখানে? তৎকালীন তিনটা সংগঠনের নাম নেওয়া হয়েছে। আল্লাহ ভালো জানেন ৭১ সালের ওই চরম সময়ে কার কি ভূমিকা ছিল। আল্লাহ তার নিখুঁত পূর্ণাঙ্গ একমাত্র সাক্ষী। আমরা যারা আছি, তারা আংশিক সাক্ষী। কিন্তু, আল্লাহই পূর্ণাঙ্গ সাক্ষী। আমরা চাই, প্রিয় বাংলাদেশ রাজনীতির সুস্থ ধারায় হোক। দেশের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক সংগঠন তার কার্যক্রম পরিচালনা করুক।”
শফিকুর রহমান বলেন, “৪৭-এ একবার, ২৩ বছর পর আবার মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়বার মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা দেশ এবং জাতির জন্য বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে লড়াই করেছিলেন তাদের সকলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। এ সময় যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছে সেটিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদের অনেকেই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন, আমি তাদের সকলের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আল্লাহর দরবারে আল্লাহ যাতে তাদেরকে শহীদ হিসেবে কবুল করেন সেজন্য দোয়া করছি। দেশ স্বাধীন হয়েছে বুক ভরা আশা নিয়ে। মানুষ চেয়েছিল, এই দেশটা একটা মানবিক দেশ হবে। সমাজের সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। কিন্তু, স্বাধীনতার পরে অনেকটা হয়েছিল তার উল্টো।”
জামায়াতের আমির বলেন, “বেদনার সঙ্গে জাতি লক্ষ্য করলো, দেশের শাসকেরা সেটাই ভুলে গেলেন। তাদের শাসন ক্ষমতার একপর্যায়ে এসে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে তারা একদলীয় বাকশাল কায়েম করলেন। এই বাকশাল কায়েমের ইতিহাসও খুব বেদনাদায়ক। ৭৩- এ যে সংসদ গঠিত হয়েছিল আজকের এই সংসদে সেরকম কোনও উপস্থিত আছেন কি না আমার ধারণা নেই। এই সংসদ মাত্র সাত মিনিট আলোচনা করে বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করেছিল এবং একদলীয় বাকশালের জন্ম দিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে দেশের তখনকার বিদ্যমান সবগুলা রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
“এমনকি, আওয়ামী লীগ এতটা বেপরোয়া হয়েছিল যে, তারা নিজের দলকেও নিষিদ্ধ করলো। ৭৫ এর পট পরিবর্তনের পর ক্ষমতার ধারাবাহিকতায় জিয়াউর রহমানের হাতে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরে, যার সুফল পরবর্তীতে জাতি পেয়েছে। আজকের পার্লামেন্টও সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। তিনি জনগণের মনের ভাষা পড়তে পেরেছিলেন এই জন্যে তাকে যখন নির্মমভাবে খুন করা হলো। তখন দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার সময় তিনি ইতিহাসের বিরল সম্মান নিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন।”


